ফারহানা শারমিন
বাসায় একা, একটু বাইরে বের হলে ভালো লাগতো। মুহূর্তেই ইচ্ছাটাকে মেরে ফেললাম, আর বাড়তে দিলাম না। বড় ছেলে কোচিং শেষে বাসায় ফিরবে, সেজন্যে চুপচাপ বসে আছি ।
ছোট ছেলেটা আমার ন্যাওটা । কিন্তু সে আজ তার বাবার হাত ধরে চলে গেলো এক জায়গায় ইফতার করবে বলে ।
মাঝে মাঝে শূন্যতা আঁকড়ে ধরে ভীষণভাবে। তবে এখন আমার এই মধ্য বয়সে একা থাকতে এতোটা খারাপও লাগে না বরং আশেপাশের কিছু মানুষের বিরূপ মানসিকতার মুখোমুখি হবার চাইতে একা থাকতে এখন বেশ লাগে।
মন এখন অনেক পরিপক্ব, এখন একা একা থেকে আর স্মৃতি হাতরে বেড়াই না বরং একাকীত্ব কে উপভোগ করি। একলা-একা সময়টুকু নিজের করে নেই ।
আফসোস! বন্দীত্ব। এইযে দায়িত্ব, এই দায়িত্ব থেকে বের হতে পারি না। জড়িয়ে গেছি অনেক আগে থেকেই। চাইলেই এ থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়, অভ্যস্ত হয়ে গেছি ।
এই যে সবাই আমাকে বাসায় থাকার দায়িত্ব দিয়ে বের হয়ে গেলো, তারাও অভ্যস্ত হয়ে গেছে এই ভেবে যে, আমি তেমনই একজন মানুষ যার অবস্থান বাসার ভেতরে। কেউ নাই বাসায়, অসুবিধা নাই…আমি আছি তো! বাসা পাহারা দিবে কে ? অসুবিধা নাই । আমি আছি তো! ছেলে ফিরবে, কি খাবে? কে দেখবে ? অসুবিধা নাই। ওর মা আছে বাসায়!
সবার মনে বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেছে যে, বাসায় ছেলেদের মা তো থাকবেই, সমস্যা নাই।
আর আমার জীবনসঙ্গী, সেও আটপৌরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একজন সোজাসাপটা প্রতিনিধি । স্ত্রীকে ঘরে থাকতে হবে, ঘর সামলাতে হবে। এর বাইরে খুব বেশি চিন্তা করতে পারেনা তারা ।
কিন্তু তাঁরও যে সাধ জাগে আকাশে উড়াল দেওয়ার অথবা ঘরে থেকে বের হয়ে একটু নি:শ্বাস নেওয়ার, এইসব গভীর চিন্তা কজনই বা করতে পারে? স্ত্রী মানেই রোবট, ঘরে কাজ করবে, ঘরে থাকবে, ঘর-দোর সাজাবে এবং স্বামীর আদেশ পালনে বাধ্য থাকবে। তারা নারীকে কেবল চায় রান্নাঘরে, চায় বিছানায় । তবে এর ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়।
অনেক নারী পরিবারের সকলের এরকম বদ্ধমূল মানসিকতাকে এড়িয়ে অথবা জীবনসঙ্গীর বন্ধুত্বমূলক আচরণের কারণে মুক্ত বিহঙ্গে ডানা মেলে উড়তে পারে। কিন্তু অনেকেই পারে না। আমি এই না পারার দলে ।
আমার বের হয়ে বাইরে যাবার পথ বন্ধ। বন্দীত্বই হচ্ছে আমার নিত্যসঙ্গী। আমার এই একাকীত্বকেই আমি ভালোবাসি ভীষণভাবে।
ফারহানা শারমিন, হোমমেকার

