0

ঠিকানার ঠিকানা পৌঁছে যাক দেশ থেকে বর্হিবিশ্বে

Share

আফরিন তাইয়্যেবা আলিফ 

আমার ওপর প্রকৃতির একটা প্রভাব সবসময়ই ছিল। বাসার ছোট বারান্দায় পিটুনিয়া,গাঁদা, বেলি সহ আরও কিছু ফুলের গাছ আছে। বলতে গেলে ছোটখাটো একটা বাগান। বাসার পাশেই একটা পার্ক। সেই খোলা জায়গার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই একদিন মনে হলো, কেমন হয় আমাদের সবুজ প্রকৃতি ঘেরা ঠিকানা রেস্টুরেন্টে যদি একটু রঙ যোগ করি। ঠিকানার শুরুতেই কিন্তু ফুল ছিল না। ভাবনামতো প্রথম দফায় ছোট পরিসরে যখন ফুল দিয়ে ঠিকানা সাজাই তখনই বুঝতে পারি, আমার মতো অন্য অনেকেই প্রকৃতির মাঝে থাকতে খুব পছন্দ করেন। এর মাঝেই বারবার ফিরে ফিরে আসতে চান। একটা নির্দিষ্ট সময় পর ফুলগুলো যখন মরে গেলো তখন দেখলাম অনেকেই এসে ফুল খুঁজছেন। তারপর বড় পরিসরে পিটুনিয়া ফুল দিয়ে সাজাই আমার স্বপ্নের ‘ঠিকানা’।

পিটুনিয়া ফুলটা অনেক ঝাঁকরা হয়ে ফোটে। যেটা অন্য ফুলে হয়না। আমি চেয়েছিলাম পুরো বিল্ডিংয়ে ফুল ছাড়া অন্য কিছুই দেখা যাবেনা। পিটুনিয়া সেটা কাভার করেছে। আর পিটুনিয়ায় অনেকগুলো কালার পাওয়া যায়। যেমন আমি সাদা, গোলাপী, বেগুনী, লাল, ম্যাজেন্ডা এমন সব রঙের পিটুনিয়া ব্যবহার করেছি। আর এটা যত্ন করলে পাঁচমাসের মতো টিকে থাকে। তাই এই কাজে পিটুনিয়া ফুলটিকেই সবদিক থেকে আমার কাছে ভাল মনে হয়েছে। প্রথমবার যখন করলাম তখন ত্রিশ হাজার পিটুনিয়া ফুলের গাছ লাগিয়েছিলাম।

 কিন্তু এ বছর আমি আরও খানিকটা আইডিয়া যোগ করি ঠিকানায়। ভাবছিলাম কেমন হয় যদি এই ফুল দিয়েই তুলে ধরা যায় আমাদের ইতিহাসকে? তখন তৈরি করি ফুলের শহীদ মিনার। এখন দেখি ঘুরতে এসে বাচ্চারা শহীদমিনার সম্পর্কেও জানতে চায়। শহীদমিনার সহ পুরো ঠিকানা সাজাতে সাত লাখ পিটুনিয়া গাছ লাগাই। তবে এ ফুলটা কিছুটা সেনসিটিভ। একটু বৃষ্টি হলে মরে যায়, পানি না দিলে মরে যায় আবার বেশি পানি দিলেও মরে যায়। তাই নিয়মিত যত্নের প্রয়োজন হয়। এই গাছগুলো দেখাশোনা করার জন্য ৩০ জন মালী নিয়োজিত আছেন।

 প্রতিদিন এখানে যে মানুষগুলো আসেন তাদের তৃপ্তি দেখে সত্যিই আমার অন্যরকম একটা ভালো লাগা কাজ করে। না গেলেও আমার মন পড়ে থাকে ঠিকানায়। যখন থাকি তখন মানুষের  রিয়েকশন গুলো দেখতে বেশ ভাল লাগে। তারা যখন নিজেদের মধ্যে বলাবলি করেন ‘খুব সুন্দর জায়গাটি অন্যরকম’ তখন আমিও তৃপ্তির নি:শ্বাস ফেলি।  এর চেয়েও আরও ভাল লাগে যখন আমার কাজ দেখে উৎসাহিত হয়ে অন্যরাও কিছু করতে চায়। সত্যি বলতে আমি  খুব হ্যাপী থাকি তখন।  

বর্তমান ডিজিটাল যুগে অনেকেই অনেক কিছু করছে। যারা বড় কিছু করছেনা তারাও কিন্তু ছোট ছোট অনেক কাজ করছে। অনেকের মাঝেই অনেক ট্যালেন্ট আছে। আর একজনকে দেখেই অন্যজন উৎসাহিত হয়। যেমন আমি যখন স্কুলে পড়তাম, তখনই দেখতাম আমার অনেক ফ্রেন্ডস পড়াশোনার পাশাপাশি এটা সেটা করছে।  তখন মনে হতো ওরা যখন পারছে আমি কেন পারবোনা? এভাবে আমি একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই ঠিকানা রেস্টুরেন্টটি তৈরি করি। আবার প্রতিবেদনে আমার কাজ দেখে  এক গ্রামের একজন ছেলে পানির উপর টিনের রেস্টুরেন্ট বানিয়ে ফেলেছে। এটা আমার খুব ভাল লেগেছে যে, আমার মাধ্যমেও কেউ উৎসাহিত হচ্ছে। এভাবেই আমরা একজনকে দেখেই অন্যজন উৎসাহিত হই। তাই সেটা যদি ভাল কাজের মাধ্যমে হয় তাহলে অবশ্যই তা আমাদের দেশের জন্য মঙ্গলজনক। আমি যদি ভাল কিছু করে দেখাতে পারি কিছু  মানুষ হলেও  ভাল কিছু শিখবে এবং আমাদের সোসাইটির জন্য ভাল কিছু নিয়ে আসতে সক্ষম হবে। 

বর্তমানে আমি  নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে  বিবিএ পড়ছি। এর পাশাপাশি একটা ইন্টেরিয়র ও এক্সটেরিয়রের কোসর্ করেছি।‌ স্কুললাইফ শেষের পর আমি যখন ঠিকানা বানানোর উদ্যোগ নিই তখন একটা বছর গ্যাপ দিই পড়াশোনায়। কারণ আমি চাচ্ছিলাম যে কাজে হাত দিয়েছি সেটা যেন ভালভাবে করতে পারি। সেক্ষেত্রে পড়াশোনায় একবছর ছাড় দিতে হয়েছে আমাকে। তবে সেটা যে আমার ভুল সিদ্ধান্ত ছিল না তা বুঝতে পারি এখন। এছাড়াও করোনার সময় অনলাইন ক্লাস হওয়ায় আমার পড়াশোনার এই একবছরের গ্যাপে এতোটা ক্ষতি হয়নি। এখন আমি পুরোদমে ক্লাস করছি যেহেতু অফলাইন ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। সপ্তাহে এখন দুই থেকে তিনদিন আমি যাই ঠিকানায়। ক্লাস শেষে বা সময়গুলো সেভাবেই ব্যালেন্স করে নিই। ব্যালেন্স করাটা কিছুটা টাফ হলেও যেহেতু এ কাজে আমার অনেক আগ্রহ আছে তাই বাসায় বসে হোক বা বাইরে থেকেও খোঁজ-খবর নিয়ে ম্যানেজ করি। মিটিং থাকলেও সেভাবে সেট করি যখন আমার ক্লাস থাকেনা সেই সময়টাতে।  

শুরুতে কিছুটা ভয় পেয়েছিলাম। যেহেতু আমার কোন অভিজ্ঞতা ছিলনা। কিন্তু আগ্রহটা ছিল আর আমাদের এরকম প্রাকৃতিক পরিবেশে সুন্দর জায়গাটা ছিল। প্রথমে বাবা-মাকে বলি। তারা আইডিয়া শোনে আমাকে উৎসাহ দেন। সাপোর্ট করেন। তখন আমার মায়ের অলরেডি একটা ক্যাটারিংয়ের বিজনেস আছে তাই তিনি খাবারের দিকটায় আমাকে সাপোর্ট দিতে পারছিলেন। শুরুতে বাবা-মা ছাড়া আমি এই উদ্যোগ নিয়ে তেমন কারো সাথে শেয়ার করিনি। কতটুকু করতে পারব বা তাদের প্রত্যাশা মতো যদি না করতে পারি এসব ভেবেই আর কারও সাথে শেয়ার করিনি। কিন্তু ঠিকানা যখন একটু একটু  কর মানুষ চিনতে শুরু করেছে তখন আমার আশেপাশের পরিচিত, বন্ধুবান্ধব সবাই অনেক সাহস যুগিয়েছে। 

ঠিকানায় ফুলের তৈরি শহীদমিনারটি উচ্চতায় ৩৪ ফিট আর প্রস্থে ২২০ ফিট। আমি রিসার্চ করে দেখলাম ফুল দিয়ে এত বড় শহীদমিনার বা এমন কিছু  এখনো হয়নি  যেটা তাদের  ইতিহাসকে তুলে ধরে। সম্প্রতি ফুলের শহীদ মিনার নিয়ে আমরা গিনেস বুক কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে  এপ্লাই করেছি। তাদের কাছ থেকে পজিটিভ সাড়া পেয়েছি এবং বিভিন্ন ডকুমেন্টস চাইলে সব ডিটেইলস পাঠিয়েছি। তারা জানিয়েছে ইন্সপেকশনের জন্য আসবে। তবে এখনও আসেনি। প্রসেসটা একটু স্লো। আমি বলব, না হলেও সমস্যা নেই। আমি এতেই খুশি যে আমার দেশের মানুষ প্রকৃতি ঘেরা এই রেস্টুরেন্টকে পছন্দ করে বার বার ছুটে আসছেন। মানুষ এখানে এসে আমাদের ইতিহাসকেও নতুনভাবে দেখছে। বা খেতে এসে সন্তানদের সাথে তা নিয়ে আলোচনা করছে। এতেই আমি অনেক তৃপ্তি পাচ্ছি। 

ভবিষ্যতে আমি  ঠিকানাতে আরো বৈচিত্র্য আনতে চাই। শুধু পিটুনিয়া নয়, আরো ভিন্ন ভিন্ন  ফুল দিয়ে সাজাতে চাই ঠিকানাকে এবং  অনেক বড় করতে চাই। আমি চাই ঠিকানার ঠিকানা যেন পোঁছে যায় দেশ থেকে বর্হিবিশ্বে। এছাড়াও ইন্টেরিয়র এক্সটেরিয়র ডিজাইনিংয়ের  উপরও আগ্রহ আছে আমার। আমি কিছু স্যোশাল ওয়ার্ক করি। এসব নিয়েই ভবিষ্যতে কাজের পরিধি আরও বাড়াতে চাই। 

যারা উদ্যোগ নিয়ে কিছু শুরু করতে চান তাদের জন্য বলব, আপনি  সেটাই করবেন  যেটার উপর আপনার সবচাইতে বেশি আগ্রহ আছে। কারণ এই কাজটিকে নিয়েই আপনার সারাজীবন থাকতে হতে পারে। তাই কাজের সাথে যদি ভাললাগাটা না থাকে তবে একসময় আপনি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন বা আনন্দ নিয়ে কাজটি করতে পারবেন না। আর যে কাজটি শুরু করবেন সেখানে প্রচুর সময় দিতে হবে আপনাকে। যত বেশি সময় দিবেন তত বেশি ভাল হবে কাজটা। নিজেকে প্রতিনিয়ত ডেভেলপ করতে পারবেন। ভয় পাওয়া যাবেনা এবং ভুল হলে সেখান থেকেই  শিখতে হবে। কে কি বলল সেদিকে নজর না দেয়াই ভাল। বাবা- মা বা পরিবারের খুব কাছের মানুষ ছাড়া অন্য কারও উপর কোন প্রত্যাশা রাখবেন না।  আপনাকে কেউ এসে সাহায্য করবে সে প্রত্যাশা না করে নিজের মতো এগিয়ে যাবেন। 

আফরিন তাইয়্যেবা আলিফ (উদ্যোক্তা) ঠিকানা, ডে আউটার্স