0

পাঁপড়

Share

তুষার আবদুল্লাহ

সজনেপাতার ফাঁক দিয়ে যেটুকু রোদ্দুর এসেছে, সেই আলোর ছায়া কালো কফির উপর পড়েছে। কফি পেয়ালায় নিজের প্রতিকৃতি দেখতে ভালোবাসে পুঁথি। আজ ওর জায়গা দখল করে নিল রোদ্দুরের ছায়া। এই সময়ে সাধারণত কফি খেতে অভ্যস্ত নয় পুঁথি। সকালে নাশতার সঙ্গে খাওয়া না হলে বারটায় একবার খেয়ে নেয়। না হলে একেবারে রাতে শুতে যাবার আগে। বন্ধু, সহকর্মীদের সঙ্গে রুটিনের বাইরেও কখনো কখনো খাওয়া হয়। কিন্তু আজকের মতো ভরদুপুরে কফি খাওয়ার অভ্যাস নেই। এখন অবশ্য নিজের ইচ্ছেতে কফি খেতে বসেনি ও। ফুলতির হঠাৎ ইচ্ছে করেছে কফি খেতে হবে, তাই পুঁথিকেও খেতে হবে। সেই খাওয়াটি নিজের অফিসে খেলে চলবে না। কোনো শপে বসে খেতে হবে। ফুলতি বসেছে লালমাটিয়ার একটা কফিশপে। পুঁথি বসেছে বনানীর কফি শপে। লালমাটিয়ায় অর্ডার হয়েছে কাপাচিনো সঙ্গে চিকেন ললিপপ। বনানী প্রথমে একটু মুশকিলে পড়েছিল, এখানে চিকেন ললিপপ হয় না। পরে চিকেন নাগেট খাবার অনুমতি মিলেছে। লালমাটিয়ায় যতটা সময় নিয়ে কফি খাওয়া চলবে, বনানীতেও একই সময় নিয়ে কফি শেষ করতে হবে। এক অদ্ভুত খেলায় কেমন করে যেন জড়িয়ে পড়েছে পুঁথি। ফুলতি নামের মেয়েটির সঙ্গে পরিচয় ফেইসবুকে। দীর্ঘদিন দেখে আসছে ওর সব পোস্টেই লাইক, কমেন্ট দিয়ে যাচ্ছে মেয়েটি। স্ট্যাটাস দেয়া মাত্র অনিবার্যভাবে যেন প্রথম লাইকটি ফুলতিরই হবে। খুব কম সময়েই অন্যরা সুযোগটি পায়। কখনো ইনবক্সে কড়া নাড়েনি। কী করে যেন পুঁথির দিক থেকেই বেখেয়ালে চলে গেছিল ‘হ্যালো’। কবে গেছিল, কিভাবে গেছিল পুঁথি জানে না। অনেক দিন পর আচমকা ইনবক্সে লেখা এল, বলেন। পুঁথি প্রথম উত্তর দিতে চায়নি। কিন্তু দেখল তার দিক থেকে ফুলতির ইনবক্সে কবে যেন হ্যালো লেখা হয়েছে। ভেবেচিন্তে পুঁথি লিখল, বলার কিছু নেই।

পাল্টা উত্তর এল, তাহলে হ্যালো বললেন কেন? পুঁথি লিখল, যখন ডেকেছিলাম, সাড়া দেননি। সময়ের কথা সময়ে বলতে পারিনি। বলার ইচ্ছে মরে গেছে। ফুলতির দিক থেকে কোনো উত্তর এল না। আবার ইনবক্সে কড়া নাড়া বন্ধ। পুঁথি নিজে থেকে দুই-একদিন উঁকি দিয়েছে। কিছু লিখতে গিয়ে পরে আর লেখেনি। মেয়েটা যদি বেহায়া ভাবে। ভাবতে পারে খাতির জমাতে ছেলেটা বেহায়াপনা করছে। থাক, যদি আবার তার মনের ইচ্ছেমতি তাড়া দেয়, তবে নিজে থেকেই কড়া নাড়বে। আপতত লাইক-কমেন্ট চলতে থাকুক। এক সময যখন পুথিঁর মন থেকে ফুলতি বিলুপ্ত প্রায়, তখনই একদিন ফুলতি কড়া নেড়ে বলল, রোদ কেন দেয়ালে পিঠ এলিয়ে দেয় জানেন? মেঘের ছায়া কেন উঠোনে আসন করে বসে পড়ে জানেন? বৃষ্টি কেন ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ে ব্যালকনিকে উসকে দেয় উদার হতে জানেন? পথ কেন চলতে চলতে আবার পেছন ফিরে তাকায় জানেন? পুঁথি উত্তর লেখে, জানি না। ফুলতি লেখে, আপনার জন্য। শুধুই আপনার জন্য। না হলে ওদের কি দায় পড়েছে এই করুণাটুকু করার? এক সম্মোহনে পড়ে গেছিল পুঁথি। সেই আবহেই ও লিখে ফেলল, আপনার করুণা হবে? ফুলতি জানতে চাইল, কী উপলক্ষে করুণা? পুঁথি জানাল, আমাকে বন্ধু করার। ফুলতি প্রথমে অসংখ্যবার লোল লিখে তারপর লেখে, ওয়াও, সবশেষে লেখে স্বাগতম বন্ধু। ফুলতি টেক্সট করল মোবাইলে। জানতে চাইল, কফির মগে কয়টা চুমুক দেয়া হয়েছে? কী এক পরাধীনতার মধ্যে পড়া গেল। কফির মগেও গুনে গুনে চুমুক দিতে হবে? ফুলতি নয়টা চুমুক দিয়েছে, আরো নাকি আট-নয়টা চুমুক দরকার হবে। নিজের মগের দিকে তাকিয়ে পুঁথি দেখল, দুই-তিন চুমুকেই সাবাড় করা যাবে। পুঁথি এমনিতেই গরম কফি খায়, ফুলতির ঠান্ডা করে খাওয়ার অভ্যাস। মেয়েটি পারেও বটে, লিখে পাঠিয়েছে, এটি তাদের ছাব্বিশতম ডেটিং। পুঁথি ডায়েরি কিংবা মনে কোথাও সংখ্যা টুকে রাখেনি। আসলে ও কোনো কিছুই হিসেব করে করে না। এই যে ফুলতির সঙ্গে পরিচয়, বন্ধুত্ব এর পরিণতি কোন দিকে যাচ্ছে, কোথাও গিয়ে থামবে কিনা, এ নিয়ে কখনো ও কিছু ভেবেছে বলে মনে হয় না। ফুলতি ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, ও বিনা আপত্তিতে সঙ্গে কখনো হেঁটে, কখনো দৌড়ে যাচ্ছে। যেদিন ফুলতি ক্লান্ত হবে, পুঁথিও থেমে যাবে। সর্ম্পকটাকে ফুলতি প্রেম বলতে শুরু করে বেশ অনেক দিন। যেদিন থেকে প্রেম মনে করছে, সেদিন থেকেই ডেটিং গণনা শুরু। পুঁথি প্রেম, বন্ধুত্ব এসব সম্পর্ককে আলাদা করতে পারে না। ওর কাছে কারো প্রতি যদি বাড়তি কোনো অনুভূতি তৈরি হয়, কারো সঙ্গে কিছু সময় কাটাতে মন আকুলিবাকুলি করে, তবে সেই মুহূর্তটিই প্রেম। তার পরের মুহূর্তগুলোকে প্রেম বলা যাবে না। সেগুলো গতানুগতিকতা। তারপরও সম্পর্ক টেনে নিয়ে যাওয়া হয় আবার কখনও যদি মনের দিক থেকে কোনো প্লাবন উছলে ওঠে তার অপেক্ষাতে। সব অপেক্ষার অবসান হয়, পুঁথি তা মনে করে না। তাই ও নিজেও কোনো চাহিদাসূচক এঁকে কারো সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে না। 

ফুলতির গণনার প্রথম ডেটিংয়ের দিন পুঁথি বুঝতেই পারেনি কী ঘটছে। ঘটে যাবার পর বুঝতে পেরেছিল। ফুলতি ফোন করে বলল, অফিস থেকে নেমে একটু ফুটপাতে গিয়ে দাঁড়ানো যায়? পুঁথি জানতে চেয়েছিল, কেউ কি আসবে? ফুলতি জানায়, আসতেও পারে। অপেক্ষা করুন কিছুক্ষণ। পুঁথি জানতে চেয়েছিল, কিছুক্ষণ ফুরোবে কখন? ফুলতি বলে, অপেক্ষায় অস্থির হতে নেই। মোবাইলে কথা বলতে বলতেই ফুটপাতে নেমে এসেছিল পুঁথি। আকাশ ঘন কালো। কালো মেঘের ছায়ায় পথের বিটুমিনকে আরো কুচকুচে দেখাচ্ছে। যিনি আসবেন তিনি কোন পথে আসবেন তা তো জানা নেই। ফুলতি নিজেই যদি আসে, তবে ও কি লালমাটিয়ার দিক থেকে আসবে? এমনও হতে পারে আশপাশে কোথাও এসেছে কাজে, সেখান থেকে যাবার সময় দেখা দিয়ে যাবে এক ঝলক। এর মধ্যে বৃষ্টি এসে গেল। ভালো লাগছিল বৃষ্টির শুরুটা। যখন ঝমঝমিয়ে নামল তখন আর দাঁড়িয়ে থাকা গেল না। উপরে উঠতে উঠতে ফুলতির ফোন, যাক দেখা তো হলো? পুঁথি অবাক হয়ে জানতে চাইল, কার সঙ্গে দেখা হলো? ও প্রান্তে শব্দ করে হেসে ফুলতি বলছে, বৃষ্টির সঙ্গে। তারই তো আসবার কথা ছিল। পুঁথি যখন বলল, কাজের সময় এমন হেঁয়ালি করলে চলবে? ফুলতি তখন একটু অভিমান করে বলল, বাহঃ আমিও যে ফুটপাতে নেমে বৃষ্টির সঙ্গে দেখা করলাম। পুঁথি জানতে চাইল, তুমি কোথায় ছিলে? শীতল উত্তর ফুলতির, আমার অফিসের নিচের ফুটপাতে। পুঁথি ফোন দিয়ে যাচ্ছে ফুলতিকে। ফোন ধরছে না ফুলতি। এই এক অভ্যাস ওর, কাজের সময় ফোনে পাওয়া যাবে না। ফোন বেজেই যাবে, ধরবে না। দরকার যখন নেতিয়ে পড়ে তখন ফোন দিয়ে জানতে চাইবে, খুঁজছিলে? কিন্তু ততক্ষণে প্রয়োজন ফুরিয়ে ঠুস। জানা দরকার ওর কফি খাওয়া শেষ হলো কিনা। এখন পুঁথি উঠে পড়তে চায়। অফিস টাইমে এতক্ষণ কফি শপে কাটানোটা স্বস্তিকর নয়। ফুলতির সব ইচ্ছেগুলোও এসে হামলা করে অফিস টাইমে। একদিন মাত্র অফিসে ঢুকেছে, তখনই ফোন, অ্যাই, তোমাদের কারো মোটরবাইক আছে? তুমি তো আবার বাইক চালাতে পারো না। পুঁথি জানাল, আছে, তাতে তোমার কী সুবিধা হয়? হেসে ফুলতি জানাল, মোটরবাইকের পেছনে করে তুমি এগার নম্বরের ব্রিজের দিকে একটু আসবে? পুঁথি জানতে চায়, জরুরি দরকার? ফুলতি হুম বলেই রেখে দিয়েছিল। পুঁথি পাশের ডেস্কের অনুজ সহকর্মীকে নিয়ে ছুটল এগার নম্বর ব্রিজের দিকে। ব্রিজের উপরে উঠে ফোন দিল ফুলতিকে। বেশ কয়েকবার ফোন বেজে যাওয়ার পর ওপ্রান্ত থেকে জানান হলো, কাজ হয়ে গেছে, এবার অফিসে ফিরতে পারো। মেয়েটাকে কত দিন বলে যাচ্ছে পুঁথি, আসো মুখোমুখি বসি। কথা বলি। না, সে আসবে না। ফুলতির কথা হলো, মুখোমুখি বসলে ও নির্বাক হয়ে যেতে পারে। কথাও ফুরিয়ে যেতে পারে এক সময়। সবাই তো কথা তৈরি করতে পারে না, কথা কুড়ানোর অভ্যাসও নেই। তাই টেবিলের দুই প্রান্তে কিংবা পাশাপাশি বসে কফি খাওয়া হয়ে ওঠেনি আজও। 

কিন্তু প্রতিদিনের ফুলতিকে পুঁথি জানে। ওর শাড়ি, টিপ কবে কোনটি, কোন আবহাওয়ায় মানিয়ে যাবে, যায় সবই পুথিঁর বলে দেয়া। যেমন করে ফুলতি ওর শার্ট, কোট, টাই এবং জুতোতে কালি দেয়ার কথা মনে করিয়ে দিতে ভোলেনি কোনো সকালে। জড়িয়ে যেতে যেতে প্রাচীরের সঙ্গে মিশে গেছে দুজন। এ প্রাচীরের দূরত্বটি রেখে দিতে চায় ফুলতি। পুঁথির লোভ প্রাচীর ভেঙে ফুলতির হাত ধরবার। ওকে জড়িয়ে নেবার। ফুলতি প্রাচীরের নাম রেখেছে সুন্দর। ও বলে, প্রাচীর ভেঙে ফেলার পর দেখবে সম্পর্কের সুন্দরটা আর নেই। মিশে গেছে ধুলোবালির সঙ্গে। ফুলতি ঐ সুন্দরকে রাখতে চায়। পুঁথি ভাবে, এই যে হঠাৎ চমকে দেয়া, আচমকা তলব এ সবই ফুলতির নতুন নতুন রঙে দেয়ালকে সুন্দর করে রাখার আয়োজন। ফুলতি ফোন ধরেছে। জানাল, এক মিনিট বসো, তোমার কাছে একটা উপহার যাচ্ছে। উপহার পাঠানোটাও নতুন নয়। ফুলতি নিয়মিত উপহার পাঠায়। পুঁথি অনিয়মিত। তিলের নাড়–, তিলের খাজা, কটকটি, পায়রার ছাতু এমন মজাদার দুর্লভ খাবার পাঠিয়ে স্তব্ধ করে দিতে জানে ফুলতি। বিনিময়ে পুঁথি শুধু নানা রঙের চুড়ি পাঠায় ফুলতিকে। কখনো কখনো রঙিন গামছা। একবার বৈশাখে একটা কালো জামদানিও পাঠিয়েছিল। নিজের দেয়া উপহারের কাছে এক টুকরো কটকটি অনেক মূল্যবান মনে হয় পুঁথির। চিকেন নাগেটের সঙ্গে দেয়া ফ্রেঞ্চ ফ্রাইর শেষ টুকরোটা মুখে দিল পুঁথি। এক কিশোর এসে একটা প্যাকেট রেখে গেল। ফুলতির পাঠানো উপহার। র‍্যাপিং ছাড়িয়ে দেখে তিন প্যাকেট পাঁপড়। অসাধারণ মেয়েটা। সত্যিই অসাধারণ। পাঁপড় ওর কতটা প্রিয় কোনো দিনই তা ফুলতিকে বলা হয়নি। কিন্তু মন পড়ে নিয়ে ঠিকই পাঠিয়ে দিয়েছে। প্যাকেট নিয়ে কফিশপ থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে ফেইসবুকের ইনবক্সে ফুলতির টেক্সট সম্পর্কটা তেলে ভাজা পাঁপড়ের মতো স্পর্শকাতর। সাবধানে স্পর্শ করতে হয়। তাই সামনে এলাম না। একই শহরে দূরে থেকেও একজন অন্যজনকে ভালোবাসতে পারে। যেতে পারে মনের কাছে। থাক না সম্পর্কটা এমনই। কী দরকার তাকে ছুঁয়ে দেখার। সব সময় কি আর সাবধান থাকতে পারব?

তুষার আবদুল্লাহ, গণমাধ্যমকর্মী