2

ছবি ও বুলেট

Share

সেলিনা হোসেন

সকিনা বানুর মুখে পুঁটিমাছ শুনে ও ঘাবড়ে যায়। পারুলের দিকে তাকায়। কিছু বুঝতে পারে না। তারপর তড়িঘড়ি করে বলে, খালি পুঁটিমাছ ধরব না। হাওরের সব মাছ ধরব। বড় বড় মাছ। এই মাছের জন্য তো সীমানার ওই পাড়ের মানুষেরা হাওরে নেমে পড়ে। আর ওই রক্ষীরা ওদের পাহারা দেয়।

সীমান্তের এলাকায় বাস করার আনন্দ আছে, আতঙ্কও আছে এমনই মনে করে সকিনা বানু। কারও সঙ্গে গল্প করার সময় ফোকলা গালে হেসে উদ্ভাসিত হয়ে নিজের ভাবনার কথা বলে মজা পায় সে। প্রথম প্রথম অনেকে আনন্দ ও আতঙ্ক বিষয়ে জানতে চাইত। কেউ একজন জিজ্ঞেস করত, আনন্দ কী? সকিনা বানু আঙুল নাচিয়ে উত্তর দিত, আনন্দ হলো সীমান্তের এপার থেকে ওপারে তাকিয়ে থাকা। পাহাড়-গাছ-ঘর-মানুষ দেখা।

আর আতঙ্ক কী? গুলি। সীমান্ত জোয়ানদের গুলি খেলাখেলি। ওরা খেলে আর আমরা ভয়ে ছুটে পালাই। সকিনা বানুর কথা শুনে সবাই হাসে। তারাও মজা পায়। এখন আর প্রশ্ন করে না তাকে। সবাই বুঝে গেছে আনন্দ আর আতঙ্কের ধারণা। সীমান্তের এই গ্রামে সকিনা বানু সবচেয়ে বয়সী মানুষ। বারো বছর বয়সে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এই গ্রামে এসেছিল সে। এখন তার বয়স পঁচাত্তরের দু-এক বছর বেশি বা কম। সব মিলিয়ে তাঁর স্বামী বিয়ে করেছে ছয়বার। 

তিনজন মারা গেছে বাচ্চা হওয়ার সময়। একজন ডায়রিয়ায়। পঞ্চমজন মারা গেছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীর গোলাগুলির সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে। সকিনা বানু নিঃসন্তান। পাঁচ সতীনের আট সন্তানের বড় মা সে। তাদের দিয়ে সন্তানের আনন্দ উপভোগ করেছে। নিজের সন্তান না থাকার দুঃখ একদমই ভুলেছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ভোলা দ্রুত হয়েছে। তার কোনো দীর্ঘশ্বাস নেই। এখন তার কাছে আছে সংসারের বড় মেয়ের সবার ছোট মেয়েটি। বছর দুয়েক আগে মা মারা যাবার পর নাতনিকে সে নিজের কাছে নিয়ে আসে।

মেয়েটি তার গলা জড়িয়ে ঘুমায়। বলে, তোমার বুকের ওম, আমার মায়ের বুকের ওমের মতন। তুমি আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছ, নানি। তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না কিন্তু। কথাগুলো বলে কেঁদে বুক ভাসায় পনের বছরের মেয়ে পারুল। সকিনা বানু ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলে তার মনে হয়, একজন সন্তানের উত্তাপ এরচেয়ে বেশি হতে পারে না। পারুলের কপালে চুমু দিয়ে বলে, নাতনি রে, দেখিস তোকে রেখে আমি মরব না। পাথরের মতন খাড়া হয়ে থাকব তোর সামনে।

পারুল দু চোখ কপালে তুলে বলে, ঠিক তো? ঠিক করে বলো। এই, ঠিক করে বললাম। পনের বছরের নাতনি তার খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়ে। আর সকিনা বানুর কানে সে শব্দ ভেসে আসে পাহাড়ের ওপর থেকে ভেসে আসা জলস্রোতের সোঁ-সোঁ ধ্বনির মতো। সেই ধ্বনির মধ্যে ঝরনার কলতান আছে, পাখির গান আছে, আদিবাসীর কণ্ঠস্বর আছে। পারুলের হাসি জীবনের সবটুকুর কথা বলে। তা সকিনা বানুর জন্য আশ্চর্য পাওয়া। তখন ও পারুলের হাত ধরে বলে, চল শাক কুড়িয়ে আনি গে। চল, চল। তোর আঁচলে আমি শাক ভরে দেব। তুই শাকের বোঝায় হাঁটতে পারবি তো, নানি? তুই সাথে থাকলে আমি সব পারব। খিলখিলিয়ে হাসে পারুল। হাসে সকিনা বানু। হাসিতে ভরে যায় পাহাড় এবং হাওর। সকিনা বানুর কাঠির মতো শুকনো হাত ধরে পারুল বলে, নানি, দাঁড়া।

কী হয়েছে? এখন যদি একটা গুলি ছুটে আসে? আসুক। আসলে কী হবে? যদি আমার কলজে ফুটো করে দেয়। যেমন আমার মায়ের। থাম নাতনি, থাম বললাম। সকিনা বানু ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে। মুহূর্তে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পারুল বলে, চল। ও এক দৌড়ে সামনে যায়, আবার ফিরে এসে নানির সঙ্গ ধরে। বুক ভরে শ্বাস টেনে বলে, কী মিঠা বাতাস! বাতাস মিঠে হয় কেমন করে, নাতনি? বাতাসে ফুলের ঝাঁঝ থাকলে হয়। হাসতে হাসতে বলে, নানি টান, বুক ভরে বাতাস টান। সকিনা বানু জোর করে শ্বাস টেনে খুশি হয়ে বলে, কী ফুল রে নাতনি? নাম তো আমি জানিনে। জানবি না কেন? তুই তো স্কুলে যাস। আমি তো কোনো দিন স্কুলে যাইনি। এত কথা ছাড় তো নানি। ফুলের নাম দিয়ে কী হবে? ফুল তো ফুলই। ঠিক বলেছিস। তোর মাথায় অনেক বুদ্ধি নাতনি। আয়, কত্ত শাক দ্যাখ!

দুজনে পাহাড়ের পাদদেশে বসে শাক কুড়োয়। কত বিচিত্র গুল্মে ভরে আছে এলাকা। কোনটা রেখে কোনটা নেবে ঠিক করতে পারে না। শেষ পর্যন্ত দুজন মিলে সব শাক মিলিয়ে বারোমিশালি শাক বানিয়ে ফেলে। ফেরার পথে নানিকে বলে, শাকগুলো তুই ভাজবি। তুই না ভাজলে আমি খাব না। তুই কি আমার সাথে জুলুম করিস নাতনি? ধুৎ, জুলুম আবার কী? তোর সাথে প্রেম করি। প্রেম? সকিনা দু চোখ কপালে তুলে মুখোমুখি দাঁড়ায়। পারুল হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। হাসতে হাসতে নানিকে জড়িয়ে ধরে। তারপর হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যায়। সকিনা বানু একসময় হাত ছাড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। দম ফেলে। মেয়েটা তাকে হয়রান করে ফেলেছে। ও তো ওর আনন্দে ছোটাছুটি করে। ও কি নানির বয়স বুঝবে, নাকি বয়সের হিসেব রাখবে! আয় নানি, দাঁড়া। দম ফেলতে দে। আর কত দম ফেলবি? আয়। তা না হলে একটা গুলি ছুটে আসবে রে নানি। 

ও আমার মাগো, পারুল হাত-পা ছড়িয়ে রাস্তার পাশে বসে পড়ে। দু হাতে মাটি থাপড়ায়। মেয়েটির যখন শোক উথলায় তখন ও খুব আছাড়-পিছাড় করে। ওকে সামলানো দায় হয়ে পড়ে। আজও বিপদ গোনে সকিনা বানু। পারুলের পাশে বসে ওকে থামানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ও কেঁদেই যাচ্ছে। তুই কাঁদতে থাক, আমি শাকগুলা খুঁটে ফেলি। সকিনা বানু আঁচলে বাঁধা শাক ঘাসের ওপর ঢেলে দেয়। তারপর সুন্দর সজীব পাতাগুলো আলাদা করে, শুকনো মরা পাতা সরিয়ে রাখে। শাকের গায়ে লেগে থাকা আগাছা পরিষ্কার করে। বেশ লাগে কাজ করতে আর কান পেতে কিশোরী মেয়েটির কান্না শুনতে। ও গুনগুন করেই যাচ্ছে। উচ্চস্বর কমে গিয়ে নরম হয়েছে কণ্ঠস্বর। সকিনা বানুর মনে হয় কান্না কখনো গানের মতো।

এই খোলা প্রান্তরের চারদিকে কোনো কিছু নেই, শুধু কান্নার গান ছাড়া। গুলি আর এখানে কী শব্দ করবে! বেশ লাগছে বেশ ভালো লাগছে ওর। সকিনা বানু আপন মনে নিজের আঁচলে আবার বেছে নেওয়া শাক বেঁধে নেয়। আস্তে আস্তে কমে যায় নাতনির কান্নার শব্দ। দুজনই দেখতে পায়, উল্টো দিক থেকে আসছে খোকন। হাতে চিকন কাঠির ছিপ। পারুল ওকে দেখে একটু অন্য রকম স্বরে বলে, নানি, খোকন। খোকন তো কী হয়েছে? ও বলেছে, কালকে আমাকে রাঙা দাগওলা পুঁটিমাছ ধরে দিবে। পুঁটিমাছ? হ্যাঁরে নানি, হাওরের পুঁটিমাছ নাকি খেতে খুব মজা। চড় মেরে দাঁত ফেলে দেব। বাজে বকিস না, নানি। তুই আমাকে গরম ভাত রেঁধে দিবি।

তুই তো এই বাড়িতে এসে বলেছিলি আমি পানিভাত খাব না। নানি, তুই আমাকে গরম ভাত রেঁধে দিবি। আমি ফজরের নামাজের সময় উঠে তোর জন্য গরম ভাত রাঁধি। তাহলে তুই আমার দাঁত ফেলে দিবি কেন? তুই খোকনের কথা বললি কেন? পারুল মুখ নিচু করে।। অন্যদিকে তাকায়। ওর মুখের আভায় কিসের যেন চমক, তা সকিনা বানুর ছানিপড়া চোখের দৃষ্টি এড়ায় না। হঠাৎ করে তার ভীষণ ভয় করে। নাতনির হাত ধরে ভীত কণ্ঠে বলে, খোকন কি তোর প্রেম? যাহ, বাজে কথা বলবি না নানি। তখন খোকন ওদের মুখোমুখি। দুজনকে বসে থাকতে দেখে নিজেও উবু হয়ে বসে। বলে, কী হয়েছে নানি? কিছু হয়নি। তুই কোথায় গিয়েছিলি? হাওরে। মাছ পেয়েছিস? না, পাইনি। জাল পেতে রেখে এসেছি। কী মাছ ধরবি? পুঁটিমাছ?

সকিনা বানুর মুখে পুঁটিমাছ শুনে ও ঘাবড়ে যায়। পারুলের দিকে তাকায়। কিছু বুঝতে পারে না। তারপর তড়িঘড়ি করে বলে, খালি পুঁটিমাছ ধরব না। হাওরের সব মাছ ধরব। বড় বড় মাছ। এই মাছের জন্য তো সীমানার ওই পাড়ের মানুষেরা হাওরে নেমে পড়ে। আর ওই রক্ষীরা ওদের পাহারা দেয়। দরকারমতো গুলি চালিয়ে দেয়। সকিনা বানু ধমক দিয়ে বলে, থাম বললাম। খোকন থতমত খেয়ে উঠে দাঁড়ায়। বলে, যাই গো। ও মেঠোরাস্তা ধরে দৌড় দেয়। কিছুদূর গিয়ে পেছন ফিরে তাকায়। তারপর আবার দৌড় দেয়। একসময় গাছগাছালির আড়ালে চলে যায়। সকিনা বানুর মনে হয়, তার নাতনির চোখ ছলছল করছে। ও নানির হাত ধরে বলে, চল নানি। চল। শাকগুলা তো ভাজতে হবে। আমি দুপুরে ভাত খাব না। কেন? কী জানি, ভালো লাগছে না। পেট ব্যথা করছে। পেট ব্যথা?

সকিনা বানু সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়। বুঝতে পারে নাতনির মন খারাপ। ওকে আর কিছু বলে না। হাত ধরে টেনে তুলে বলে, চল। পারুল নানির হাত ছাড়িয়ে নিজে নিজে উঠে পড়ে। হনহনিয়ে আগে আগে হাঁটে। সকিনা বানু বেশ মজা পায়। কতকাল আগে এমন একটি বয়স ছেড়ে এসেছে, আঙুলে গুনে তার হিসেব করতে থাকে। হিসেব মেলে না। বিরক্ত হয়ে আবার গোনে। ভাবে, এটা একটা খেলা কি? কে জানে। একসময় চিৎকার করে পারুলকে ডাকে। পারুল পেছন ফিরে দেখতে পায়, তার নানি তালগাছটার কাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ও চেঁচিয়ে ডাকে, আয়। সকিনা বানু উত্তর দেয় না। নড়ে না। পারুল বুঝে যায় যে ও না গেলে বুড়ি আসবে না। বুড়ি এমনই করে। ওকে দিয়ে কিছু করাতে চাইলে তখন অনড় হয়ে যায়। ও কাছে গিয়ে বলে, তোর কী হয়েছে, নানি? আমার কি তোর মতো বয়স ছিল? না। পারুলের নির্বিকার উত্তর। না? কেন ছিল না? তুই একলাফে বুড়ি হয়ে গিয়েছিলি। একলাফে বুড়ি? তাহলে আমার প্রেম ছিল না? হি-হি করে হেসে গড়িয়ে পড়ে পারুল। সকিনা বানু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলে, শয়তানি করিস কেন?

তোর তো আমার বয়সে বিয়ে হয়েছিল। বিয়ে হয়ে গেলে আর প্রেম হয় না। সকিনা বানু কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থেকে কিছু একটা ধরার জন্য হাত বাড়ায়। পায় না। ততক্ষণে তার মাথা টলে ওঠে এবং পড়ে যায়। পারুল পাশের ডোবা থেকে হাতের মুঠিতে সামান্য পানি এনে নানির মুখ মুছিয়ে দেয়। ওড়না দিয়ে বাতাস করে। মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে নানি নানি করে ডাকে। কতক্ষণ কেটে যায় জানে না মেয়েটি। নিথর প্রান্তরে লোক চলাচল তেমন নেই। হঠাৎ হঠাৎ দু-একজন চলাচল করে, কিংবা গরু নিয়ে আসে রাখাল। আজ তেমন কেউ নেই। পারুলের বারবার মনে হয়, নানি কি মরে যাবে? ওর মায়ের মতো? একসময় চোখ খোলে সকিনা বানু। পারুল উচ্ছাসিত হয়ে বলে, নানি, আমার বয়সে তোর প্রেম ছিল, নানি। আমি তোকে মিথ্যা কথা বলেছি। সকিনা বানু ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলে, না, ছিল না।

 তুই ঠিক কথা বলেছিলি। কোনো দিন ছিল না। সকিনা বানু ওর কপালে চুমু দিয়ে বলে, নাতনি, তোর জীবনে যেন প্রেম থাকে। প্রেম না থাকলে বুড়া বয়সে তুই আমার মতো মাথা ঘুরে পড়ে যাবি। নানি, ও নানি পারুল নানিকে ব্যাকুল হয়ে জড়িয়ে ধরে। সকিনা বানু হাঁটতে হাঁটতে বলে, আমি যখন থাকব না, তখন আকাশ থেকে দেখব তোর জীবনে প্রেম আছে, নাতনি। গুনগুন করে গানের মতো কথাগুলো বলে যায় সকিনা বানু। দু চোখ বেয়ে জল গড়ায়। পারুলের সাধ্য নেই বেদনার ভাষা বোঝার। পারুলের সাধ্য নেই প্রেমহীন বেঁচে থাকার কান্না ছুঁয়ে দেখার। ও শুধু ভাবে, নানি কাঁদুক। কেঁদে কেঁদে নানি একদিন পাখি হয়ে উড়ে যাক। উড়ে উড়ে নানি একদিন ওকে দেখতে আসবে। 

দেখবে লাল দাগ-আঁকা পুঁটিমাছ ধরে কচুপাতায় করে নিয়ে আসবে খোকন। বলবে, দেখো, আমাদের প্রেম এমন সুন্দর। প্রেমে রঙ থাকে, প্রাণ থাকে। গান থাকে, সৌন্দর্য থাকে। প্রেমকে জয় করতে হয়, সোনার মেয়ে। দুজনে বাড়ি এসে পৌঁছায়। সকিনা বানু পারুলকে বলে, তুই গোসল করে আয়। আমি এখন শাক ভাজব। আমি দুই থালা ভাত খাব, নানি। দেব। তোকে আমি সোনার থালায় ভাত দেব। সেদিন থেকে দুজনের সম্পর্ক অন্য রকম হয়ে যায়। আরো কাছের হয়, আরো পরস্পরকে বোঝার হয়।

মাসখানেক ধরে এলাকায় প্রবল উত্তেজনা। সীমান্তের অপর পারের লোকেরা এসে হাওরের মাছ ধরে নিয়ে যায়। ওদের সহযোগিতা করে সীমান্ত রক্ষীরা। এ দেশের সীমান্ত রক্ষীরা পাল্টা গুলিবর্ষণ করে। শুরু হয় আতঙ্কিত গ্রামবাসীর ছোটাছুটি। সুবিধামতো জায়গায় আশ্রয় নেয় তারা। বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যায় দূর এলাকাতেও। আতঙ্কে দিন কাটায় তারা। নানির সঙ্গে পালাতে হয় পারুলকেও। বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় সকিনা বানু অন্যদের মতো দ্রুত নিরাপদ জায়গায় যেতে পারে না। দুজনে প্রায়ই রাস্তার ধারের কোনো কিছুর আড়ালে বসে পড়ে। সেদিনের পর থেকে খোকনের সঙ্গে দেখা হয়নি পারুলের। হাওরেই কাটে ওর সারাদিন। গোলাগুলি হলে বুকের ভেতরে ঢিবঢিব শব্দ হয় পারুলের। ঠিক জায়গায় পালাতে পেরেছে তো খোকন!

শুকনো মুখে নানির দিকে তাকায়। বলতে পারে না কোনো কথা। সকিনা বানু নাতনির হাত ধরে দূর পাহাড়ের দিকে চেয়ে থাকে। ভয়ে তার কণ্ঠরুদ্ধ। মাঝে মাঝে বলে, এই দৌড়ঝাঁপ আর সয় না রে নাতনি। আমি আর দৌড়াতে পারব না। তুই একলা পালা। না, তা হবে না। আমি তোকে রেখে যাব না। গুলি যদি তোকে খায়? খেলে খাবে। আমি তো চাই খাক। পারুল নানির মুখ চেপে ধরে। চোখ গরম করে তাকায়। শাসনের ভাষা কী তা বুঝিয়ে দেয়। সকিনা বানু ওর শাসন উপভোগ করে। ভাবে, গোলাগুলির ভেতরে ওর এই নাতনি এখন বেঁচে থাকার আনন্দ।

একদিন প্রবল গোলাগুলির মধ্যে সকিনা বানু দৌড়াতে পারে না। রাস্তার ধারে গড়ে ওঠা বড় পাথরের ঢিবির আড়ালে পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে বসে থাকে। সকিনা বানুর মুখ মাটির দিকে নত। হাতজোড়া কোলের ওপর ন্যস্ত। তার দৃষ্টি বোঝা যায় না। মাথায় কাপড় তোলা। সাদা শাড়ি, সাদা ব্লাউজ পরে আছে। তার খালি পা শক্ত পাথর ছুঁয়ে আছে। অনবরত নরম মাটির ওপর হেঁটে যাওয়ায় তার পায়ের নিচে পাথুরে আস্তর। তার পরও মনে হচ্ছে, সকিনা বানু এখন ধ্যানমগ্ন গার্গি। আতঙ্ক এবং বিষাদের ঊর্ধ্বে তিনি একজন ঋষি তিনি আতঙ্কিত এই গ্রামের সকিনা বানু। তার মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় বুলেট।

অপরদিকে বসে আছে পারুল। ওর চোখ খোলা। আর দৃষ্টি সামনে। যত দূর দেখা যায় ও দেখছে। আতঙ্ক ওকে চুপসে রেখেছে। ও পরে আছে হলুদ কামিজ, সাদা পায়জামা। খয়েরি রঙের লম্বা ওড়নাটি পা পর্যন্ত নামানো। ওর খালি পা কাদামাখা। মেঠোপথে দৌড়ে আসার সময় পায়ে কাদা লেগেছে। অমসৃণ এবড়ো-থেবড়ো পাথরের ওপর রাখা ওর পা। ও যেন মাটি এবং পাথরকে প্রয়োজনের একই সমান্তরালে রেখেছে। ও জানে কোনটার কী দরকার। ও তাকিয়ে আছে সামনে। মাটি ও পাথরের দ্বৈত মিশ্রণে গড়ে ওঠা ওর ভবিষ্যৎ। ও সেই সময়ের জ্ঞানী খনা। ও মাটি চাষ করবে এবং পাথরে ফুল ফোটাবে। যে কেউ দূর থেকে তাকালে দেখতে পায় অসাধারণ সুন্দর একটি ছবি। দুজন অসম বয়সী নারীর চিত্র স্থির হয়ে থাকে। 

কারণ ওরা কেউ নড়ে না। আতঙ্কিত গ্রামে এভাবে যে দৃশ্যপট তৈরি করা যায়, তা প্রস্ফুটিত হয় হাজার বছরের পুরনো সময়ের শ্যাওলা পড়া পাথুরে দেয়ালের গায়ে। যে তাকায় তাদের দিকে, তাদের চোখ আটকে যায়। দুজন ছবি হয়ে বসে থাকে। কোনো রকম নড়াচড়া না করে পারুল ডাকে, নানি। বল। সকিনা বানু একই ভঙ্গিতে বসে থেকে বলে। আমি আর বসে থাকতে পারব না। চারদিকে এখনও গুলির শব্দ আছে। আমরা তো গুলির শব্দ পাচ্ছি না।

তোর কানে কী হলো রে নাতনি? তখন চারদিক তোলপাড় করে একঝাঁক গুলি চলে যায় মাথার উপর দিয়ে। পারুল আচমকা চমকে উঠে সকিনা বানুর গলা জড়িয়ে ধরে। নানি, নানিরে দুজন পরস্পরের দিকে মুখ ফেরায়। সেটিও একটি অসাধারণ ছবি হয়। ছবিতে পাথরের গাঁথুনির মাটির স্তর আছে কালচে শ্যাওলার মধ্যে সময়ের হিসাব আছে আতঙ্কিত মানুষের কম্পনরত শরীর আছে। শুধু সেই ছবিতে বুলেট নেই। তখন মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ ভেসে আসে। দুজন মুখোমুখি হয়। নাতনি নানির গলা জড়িয়ে ধরে। সকিনা বানুরও মনে হয়, পারুলকে জড়িয়ে ধরার সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরের কাঁপুনি থেমে গেছে। তার কেমন জানি লাগছে। মনে হচ্ছে কোথাও কিছু ঘটেছে। আচমকা চেঁচিয়ে বলে, একটি বুলেট যেন কার বুক ফুটো করে দিল।

 ও পারুল রে, আমার মনে হয় কার বুক, কার বুকে গুলি লেগেছে, নানি? তোর কী মনে হয়? উত্তেজিত পারুলের আর্তনাদ পাথুরে দেয়ালের গায়ে অনবরত আছড়ে পড়ে। তখন হাওরের পুব পাড়ে গুলিবিদ্ধ খোকনের শরীর থেকে উষ্ণ রক্তস্রোত মাটি ভেজাতে থাকে। সকিনা বানু পারুলের ঘাড় ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে গুনগুন স্বরে বলতে থাকে, কোথায় কার গায়ে যেন গুলি লেগেছে কোথায় কে যেন মাটিতে পড়ে গড়াচ্ছে ওরে আমার বুক ফেটে যায় নানি, তোর কার কথা মনে আসছে, বল? জানি না, বলতে পারব না। তাহলে চল খুঁজে দেখতে যাই।

দুই লাফে পাথরের চাঙ পার হয়ে আসে পারুল। সকিনা বানুর সময় লাগে। পারুল তার জন্য অপেক্ষা করে না। পেছনে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে, আমি হাওরের দিকে গেলাম, নানি। আমার মনে হয় খোকন আমার জন্য পুঁটিমাছ ধরছে। মাছের গায়ে লাল নকশা আছে। সকিনা বানু চেঁচিয়ে বলে, তুই আমার জন্য থাম, নাতনি। পারুল থামে না। দৌড়ায়। তখনও মাথার ওপর দিয়ে ছুটে যায় বুলেট। ছবিটা আর নিথর থাকে না।

সেলিনা হোসেন, কথাসাহিত্যিক