0

খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি

Share

শেখ সাইফুর রহমান

বেশ কয়েকদিন ধরে ঢাকার এবং ঢাকার বাইরে ঈদ ফ্যাশন বাজার নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে বেশ আশাবাদী হচ্ছি। অন্তত গত দুটো বছর এই খাতটি দূর্বিষহ সময় পার করেছে। যখনই বাংলাদেশের পোশাক শিল্প ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল সেই মুহূর্তে করোনা মহামারী এসে এ পোশাক শিল্পে একেবারেই ধ্বস নামিয়ে দিয়েছে। ছোট বড় অনেক ফ্যাশন হাউজ বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ সংগ্রাম করে টিকে আছে।  প্রবৃদ্ধি তো ছিল না, বরং লক্ষ্য করা যাচ্ছিল ভাটার টান। মহামারী, প্রকৃতির বৈরিতা আর বিদেশী পণ্যের আগ্রাসন- এই তিনে মিলে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির সবচয়ে বড় অর্থাগমের উপলক্ষ্যকে বলতে গেলে মাটি করে দিয়েছিল। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এবার এখনও পর্যন্ত বাজার পরিস্থিতি দেশিয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির জন্য আশা জাগানো। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এই মুহূর্তে রয়েছে। এবার বিদেশী পোশাকের আগ্রাসন কিছুটা কম। মানে পাকিস্তানি পণ্য সেভাবে ঢুকতে পারছে না তবে ভারতীয় পণ্যের সয়লাব আছেই। 

তবে বিশেষত ভারতীয় সালোয়ার-কামিজের চেয়ে পাকিস্তানি সালোয়ার কামিজের চাহিদা বেশি। ভারতের পণ্য গুণ ও মানে পাকিস্তানিদের চেয়ে পিছিয়ে। সেজন্য আমাদের ক্রেতারা সেই বিবেচনায় পাকিস্তানি লন না পেয়ে দেশি সালোয়ার-কামিজের দিকে ঝুঁকেছে। অন্যদিকে ক্রেতাদের বোধদয় হয়েছে বলতে হয়। কারণ পাকিস্তানি লন না পাওয়া ছাড়াও দেশি পণ্যের প্রতি তাদের আগ্রহ এবং আস্থা উভয়ই পুনরায় নবায়িত হয়েছে। কোন সন্দেহ নেই এটা দেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির জন্য ইতিবাচক। পাশাপাাশি আরো একটা বিষয় প্রণিধানযোগ্য, দেশের ফ্যাশন হাউজগুলো উত্তরোত্তর যত্নশীল; ক্রেতারুচির প্রতি তারা মনোযোগী এবং সর্বোপরি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন পরিমন্ডলের প্রবণতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। পক্ষান্তরে ক্রেতারাও ততটাই সচেতন গুণ, মান, ট্রেন্ডের সঙ্গে। 

ফলে দেশিয় পোশাকের প্রতি পুনরানুরাগ এই মিথোস্ক্রিয়ারই ফল। প্রসঙ্গক্রমে আরো একটা বিষয় এখানে উল্লেখ বোধ করি প্রয়োজন। বেশ কয়েকবছর ধরে তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা দেশিয় ফ্যাশন বাজারে পা রাখা শুরু করেছে। বিদেশী বাজার সম্পর্কে লব্ধ দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পোশাক তৈরির দক্ষতা, সমসময়ের ফেব্রিক, কালার ও ফ্যাশন ট্রেন্ড সম্পর্কে সময়ের আগে থেকে সম্যক অবগত থাকার সুবিধা দেশিয় বাজারের জন্য উন্নততর পণ্য সরবরাহে তাদের সহায়ক হচ্ছে।

এছাড়া রয়েছে তাদের উল্লেখ করার মতো লগ্নি। এসব অনুপেক্ষনীয় কারণে ট্র্যাডিশানাল ফ্যাশন হাউজগুলোর থেকে তারা এগিয়ে থাকতে পারছে। বর্তমানে বেশ কয়েকটি হাউজ যথার্থই আন্তর্জাতিক মানের ওয়েস্টার্ন এবং ট্র্যাডিশানাল পোশাক দেশিয় ব্র্যান্ডের আওতায় বাজারজাত করছে। অল্প সময়েই তাদের উল্লেখযোগ্য ভোক্তাগোষ্ঠীও তৈরি হয়েছে। দেশিয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে তারা শক্ত অবস্থান করে নিতে সক্ষমও হয়েছে। এদের উৎকর্ষ ট্র্যাডিশনাল ফ্যাশন হাউজগুলোকে উদ্দীপ্ত করছে পূর্ণ উদ্যোমে লেগে পড়ার। ফলে দেশিয় ফ্যাশন হাউজগুলোর ভালো করার সেটাও একটা কারণ।

এবারে ইতিবাচক বাজার পরিস্থিতি নিশ্চয় দেশিয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোক্তাদের নতুন করে ভাবাবে, উৎসাহিত ও প্রণোদিত করবে সে বিষয়ে কেন সন্দেহ নেই। তবে এই আশার বাইরে নিরাশাকেও আমার বিশ্বাস তারা গুরুত্ব দিবে। এখন একাধিক সক্রিয় সংগঠন রয়েছে। তাই ঈদের পরে অবশ্যই একটা পর্যালোচনা তারা করবেন বলে আশা করা যেতেই পারে। যদিও সেটা কোন সময়েই হয়নি। কিন্তু এই উদ্যোগ না নেয়া হলেও পরে আবারও যে খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে না তা তে বলতে পারে?

আরও একটা বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে নিরীক্ষা হচ্ছে, ভালো কাজ হচ্ছে, উৎকর্ষের ঝলক দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এর বাইরেও কিন্তু রয়ে যাচ্ছে অনেক মানহীন কাজ। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির জন্য যেটা কোনভাবেই সুখকর নয়। একটা যৌক্তিক অভিযোগ তো রয়েই গেছে সব ফ্যাশন হাউজের কাজ একই রকম। কোন বৈচিত্র নেই। এটা সর্বাংশে সত্যি না হলেও অনেকাংশেই কিন্তু বাস্তব। অস্বীকারের উপায় নেই। বড় হাউজগুলো লজিস্টিকালি শক্তিশালী হওয়ায় তারা এখান থেকে অনেক আগেই বেরিয়ে এসেছে। অনেকে বেরিয়ে আসা চেষ্টা করছে। তবে এর বাইরে অনেক হাউজ কিন্তু এই একঘেয়েমি আর সময়ের সঙ্গে বদলাতে না পারার দোষে দুষ্ট। এবারও সেই ধরণের প্রচুর পোশাক বিভিন্ন হাউজে দেখা গেছে।

এবারের ঈদ ফ্যাশন নিয়ে মিডিয়ার অহেতুক উতলা হওয়ার প্রবণতাও হ্রাস পেয়েছে। যেটা দেশিয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির জন্য মঙ্গল। এর আগে আমরা দেখেছি বিভিন্ন বিদেশি পোশাক নিয়ে অকারণে হাইপ তৈরি করা হয়েছে। এবার সেটা নেই। কোন বিশেষ নামের পোশাক নিয়ে ক্রেতারা অকারণ উতলা হচ্ছে না। নি:সন্দেহে এটা একটা ইতিবাচক দিক। ঈদ ফ্যাশনে আরো মাত্রা এনেছে অনলাইন শপিং। প্রতিটি শীর্ষ ফ্যাশন হাউজেরই এই সুবিধা রয়েছে। এমনকি অনেকে কেবল ফোনেই অর্ডার নিয়ে তা ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে প্রয়োজনীয় সেবা দেয়ার মধ্যে দিয়ে বাজার বিস্তার করছে তারা। এটা যে কেবল দেশের ভেতর সীমাবদ্ধ তা নয়। বরং বিদেশেও বিস্তৃতি ঘটেছে। দেশের বাইরে থেকে অর্ডার দিলে তা যথাস্থানে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। আগে এই সুবিধা ছিল না। দেশে না এলে এসব পোশাক কেনা যেতো না বা পরিচিতরা কিনে পাঠাতো। এখন আর সেই সমস্যা নেই।

এবার ঈদে আরো একটা বিষয় লক্ষ্যণীয়, ট্রেন্ডি পোশাকের পাশাপাশি ট্র্যাডিশানাল পোশাকের প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ। সালোয়ার-কামিজের নানা বৈচিত্র লক্ষ্যণীয়। কামিজের যেমন নানা কাট আর প্যাটার্ন রয়েছে তেমনি সালোয়ারেও। কেবল সালোয়ার নয় কামিজের সঙ্গে পরার জন্য আছে নানা ধরনের প্যান্ট। এজন্য সিঙ্গল কামিজের চল এখন চোখে পড়ার মত। কেউ সেটা সালোয়ার দিয়ে পরছে তো কেউ চুড়িদার দিয়ে। কেউ বা প্যান্ট দিয়ে। এই প্যান্টেরও আবার রকমফের আছে। এই চলটা কিন্তু বেশ। এখানে আমি মিলাবে মিলিবের সৌরভ পাই। এই ট্রেন্ড ভীষণই সমসাময়িক আর আধুনিক। তবে এই মেয়েরাই কিন্তু আবার শাড়িও কিনছে। এবার উদ্যোক্তাদের মতে শাড়ি কেনার সংখ্যা বেড়েছে। যেটা আগের যে কোন বছরের চেয়ে বেশি। ফলে সব হাউজেরই শাড়ির কালেকশন উল্লেখ করার মতো।

 মেয়েদের পোশাকে ঢিলেঢালা প্যাটার্নও এসেছে। এখন ফ্যাশনের সৌন্দর্য হলো কোনটাই বাতিল করে দেয়া হয় না একবারে। থাকে পাশাপাশি, গলাগলি করে। ফলে চলে সমান্তরালে। এখানেও সেটা হচ্ছে, হবেও ভবিষ্যতে। অনেককেই উৎসবের পোশাক নিয়ে আলোচনা করতে দেখা গেছে। এবারের ঈদে কি আসবে তা নিয়েও চলেছে বিস্তর উতোরচাপান। আসলে উৎসবের আলাদা কোন পোশাক নেই আমাদের। আমরা সেই থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়। পার্থক্য একটাই থোড় বড়িটা নতুন- এই যা।

অর্থ্যাৎ উৎসবের পোশাক মানে আমরা নতুন কাপড় পরে থাকি। কোন বিশেষ কাপড় নয়। আর এই নতুন কাপড় বলতে সেই পাঞ্জাবি, ক্যাজুয়াল শার্ট, সালোয়ার-কামিজ, শাড়ি। ইদানিং মেয়েরা ওয়েস্টার্নও কেনে। এখানে বিবেচিত হতে পারে হাউজগুলোর কালেকশনে ব্যবহৃত মেটেরিয়ালের ব্যবহার। এসব মেটেরিয়াল কতটা ইনোভেটিভ আর অগতানুতিক, কতটা আরামদায়ক আর পরিবেশ ও ত্বকবান্ধব। সেখানে আধুনিকতা আর ঐতিহ্যের মেলবন্ধ ঘটেছে কিনা। অনুসৃত হয়েছে কি চলমান ট্রেন্ড।

 প্রতিবারই শীর্ষ হাউজগুলো বিশেষ বিশেষ থিমে সংগ্রহ সাজায়। এবারও সেটা হচ্ছে। আশার কথা, কেবল জমিন অলঙ্করণের ক্লিশে প্রক্রিয়ায় আটকে না থেকে কাট আর প্যাটার্ন নির্ভর পোশাকও তৈরি হচ্ছে। যেখানে কাপড়টাই মুখ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই ধারায় বেশি কাজ হচ্ছে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির অভিজ্ঞতা নিয়ে যেসব হাউজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছে সেই সব হাউজে। কারণ তারা তো এই ধরণের কাজে অভ্যস্থ। কিন্তু আমাদের ট্র্র্যাডিশানাল ফ্যাশন হাউজগুলোও এই প্রক্রিয়ায় অভিযোজিত হতে শুরু করেছে বলেই তাদের সংগ্রহে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

পরিশেষে বলতেই হয় করোনার পর এবারের ঈদ দেশিয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে। খাদের কিনারা থেকে ফিরিয়ে এনেছে। এই ইতিবাচক বিষয়কে প্রেরণা করে সঠিক দিশায় এগোতে পারলেই ইন্ডাস্ট্রির মঙ্গল। আর এই মঙ্গলের সঙ্গে জড়িত অসংখ্য মানুষ। সবার ঈদ ভালো কাটুক এই শুভকামনা থাকছে।

 শেখ সাইফুর রহমান ডেপুটি এডিটর  (অনলাইন ফিচার প্রথম আলো ও হাল ফ্যাশন), ফ্যাশন কলামিস্ট