0

জিমির একলা, নিঃসঙ্গ জীবন কাঁপিয়ে দিল অন্তরাত্মাকে! 

Share

জীবন যেখানে যেমন ( পর্ব ১১)

কুলসুম আক্তার সুমী 

দেখতে দেখতে নতুন বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসটা শেষ হয়ে এল। তবুও প্রথম মাস বলেই শুভ নববর্ষ বলেই শুরু করি। বিগত বছরের শেষদিনটি আমার জন্য অনেক আনন্দ বয়ে এনেছে। আমার তৃতীয় কাব্য সেদিন ছাপা হয়ে এসেছে প্রকাশকের কাছে। কেউ কেউ তৃতীয় কাব্য বলে আমার উচ্ছ্বাসকে অতিরিক্ত মনে করতে পারে কিন্তু আমার কাছে প্রতিটি বই নতুন মাত্রায় ধরা দেয়। ভোর বেলায় ঘুম ঘুম চোখে মোবাইলের মেসেজ অপশনে তাকিয়ে দেখি প্রকাশক বইয়ের ছবি তুলে পাঠিয়েছেন বেশ ক’টা। পরে দেখি আমাকে ট্যাগ করে উনি পোস্ট ও করেছেন— পাঠকের জন্য প্রস্তুত হয়েছে কুলসুম আক্তার সুমী’র তৃতীয় কাব্য চড়ুইভাতি জীবন… 

বছরের শেষদিনে এরচেয়ে বড় উপহার, এরচেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে!

তার ঠিক আগে খুব ভোরে উঠে কর্তা কাজে চলে যাবেন, আমার ছুটি আমি ঘুমাবো আরো কিছু সময়। খুব সন্তর্পণে উঠে গায়ে কম্বল টেনে দিয়ে নিচে চলে গেলেন। তারপর আবার রুমে ঢুকে আমার কানের কাছে মুখ এনে বললেন, তোমার লেখায় একটা শব্দ ভুল আছে ঠিক করে দাও। আমি চোখ কচলাতে কচলাতে ফোনের দিকে তাকালাম আর মনে মনে হাসলাম… ভালোবাসি বললেই কেবল ভালোবাসা হয় না। 

তার আগের বিকেলে মেয়ে আমায় অ্যানিমেটেড সিনেমা দেখাল। আর বলল, কাল তোমার পালা, তুমি কালকে একটা সিনেমা নির্বাচন করবে আমরা দু’জন মিলে দেখব। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে পাকঘরে গিয়ে জানতে চাইল, আম্মু কী রান্না করছো? বললাম, তোর প্রিয় লালশাক। মাংস দিয়ে কী করবে? বললাম বিকেল বেলা কাবাব বানাব। আজ সন্ধ্যায় কাবাব পরটা দিয়ে আমাদের রাতের খাবার হবে। মেয়ে বলল, আম্মু ইউ আর দ্য বেস্ট। 

অন্য সিনেমা দেখার ইচ্ছা ছিল, সিদ্ধান্ত পাল্টে শ্রীদেবীর ‘মম’ সিনেমা দেখলাম, দেখালাম। সিনেমা দেখা শেষ হলে মেয়ে আবার বলল, আম্মু ইউ আর দ্য বেস্ট। বছরের শেষদিন অনেকে অনেক উপহার পায় ছবি তুলে পোস্ট করে। কিন্তু মেয়ের কাছ থেকে এমন প্রশংসা এরচেয়ে বড় উপহার আর হয় না, আমার অন্তত তাই মনে হয়। 

মা-মেয়েতে বসে কাবাব বানালাম অনেকগুলো। কতক ভেজে আজ খাওয়া হবে, কতক থাকবে ফ্রিজে অন্য সময় তৎক্ষণাৎ ভেজে খাওয়া যাবে। বললাম, গোসল করে একটা নতুন জামা পর, আজ ২০২২ সালের শেষদিন। ছবি তুলব তো! মেয়ে হেসে জড়িয়ে ধরল আমায়। বলল, আম্মু তুমি সবসময় এরকমই থেকো। তোমার ভেতরে একটা ছোট্ট বেবি আছে, বেবিটাকে কখনও বড় হতে দিও না। আমি হাসি আর ভাবি— জীবনের কাছে আমি কখনো তেমন কিছু চাইনি, ভালোবাসা ছাড়া। তাই জীবন আমাকে দিয়েছে অনেককিছু সাথে অফুরান ভালোবাসা। সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা সীমাহীন। 

জানুয়ারি শুরু হল রবিবার। সোমবার থেকে আমার কাজ শুরু কিন্তু বাচ্চাদের ছুটি আছে। কাজে ফোন করে মজুমদারকে বললাম, কাল না হয় তোমরা আলবেনি গিয়ে বাংলাদেশ থেকে পাঠানো জিনিসগুলো নিয়ে আসো। পাঠিয়েছে তাও ছয় মাস হতে চলল। একটু পরেই সে আবার ফোন করে বলল, এক কাজ করলে কেমন হয়, আজ দুপুরেই চল যাই। কাল ভোরবেলায় রওয়ানা হব, তোমাকে কাজে নামিয়ে দিয়ে আমরা বাসায় এসে না হয় ঘুমাব। তোমার একটু কষ্ট হবে, তবে মেয়েটা খুশি হবে। মেয়ে তোমাকে ছাড়া কারো বাসায় যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। যেই কথা সেই কাজ— ঝড়ের গতিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে, বাতাসের গতিতে তৈরি হয়ে, বিদ্যুতের গতিতে আমরা সন্ধ্যা ছয়টাতেই আলবেনি পৌঁছাই। যে বাসায় বেড়াতে গিয়েছি ওরা আমাদের রক্ত সম্পর্কের কেউ নয়। বৈবাহিক বা অন্য কোনও সম্পর্কের আত্মীয়ও নয়। শুধু ইট বালি সিমেন্টের ঢাকা শহরে পাশাপাশি বাসায় থাকত আমার ভাই/ভাবি আর ঐ পরিবারটি। অথচ, এই বিদেশ বিভূঁইয়েও আমি তাদের বোন বা ননদ হয়ে গিয়েছি। এখনো মাছ কেটে পরিস্কার করে প্যাকেট করে আমার জন্য রেখে দেয়। আমার যেন কাটাকুটা বা ধোয়ার কষ্ট না করতে হয়। এত মানুষের ভালোবাসার ঋণ একজীবনে আমি কী করে শোধ করব ভেবে পাই না। 

ওখানে যেতেই ভাতিজা নিয়ে গেল অন্য এক বাসায়, সেখান থেকে আলবেনি বিশ্ববিদ্যালয়ে। শীতের রাতে সোডিয়াম আলোর নীচে আমরা ঘুরে বেড়ালাম কিছু সময়। এসে খাওয়া দাওয়া আর জম্পেশ আড্ডার পর মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য বিছানায় গা এলানো। ভোর সাড়ে পাঁচটায় উঠে পড়লাম, চেপে বসলাম গাড়িতে সরাসরি আমাকে অফিসে নামিয়ে দিয়ে ওরা চলে আসবে বাসায়। এত রাতে ঘুমাতে যাওয়া এবং অন্যান্য কারণে ঘুম হয়নি একদম। আবার সারাদিন কাজ করতে হবে তাই গাড়িতে উঠেই চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করি। ঘুম আসে না, একটু পর পরই চোখ খুলে বাইরে দেখি। কন্যা পাশে থেকে মৃদু ধমক দেয় ‘আম্মু চোখ খুলবানা, ঘুমানোর চেষ্টা কর। তোমার সারাদিন কাজ করতে কষ্ট হবে।’ 

তখন পূব আকাশে উঁকি দিচ্ছে ভোরের প্রথম সূর্য। ওরকম দৃশ্য দেখার আনন্দের চেয়ে ঘুমকে বড্ড ক্লিশে মনে হয়। প্রতি মুহুর্তে আকাশের রঙ একটু একটু করে বদলায়। আশি থেকে নব্বই মাইল গতিতে ছুটে চলছে গাড়ি তার চেয়েও বেশি গতিতে যেন কেউ ছড়িয়ে দিচ্ছে রঙীন তুলির আচড় সারা আকাশ জুড়ে। এ অপার্থিব দৃশ্য দেখতে দেখতে একসময় ঠিক চোখ বন্ধ হয়ে আসে। কিছু সময় তন্দ্রার মত আচ্ছন্ন থাকি, ততক্ষণে পনের মিনিট দেরিতে পৌঁছে গেছি আমার অফিসে। বছরের শুরুটা হল এক তড়িৎ ভ্রমনের মধ্য দিয়ে, দেখা যাক সারা বছর কেমন যায়! 

জানুয়ারির দ্বিতীয় দিনের শেষ প্রহরে আরো চমক এসে হাজির। কবিতার পাশাপাশি নিজের চারপাশের পৃথিবীর কথা গল্প কিংবা মুক্ত গদ্যাকারে সবসময়ই লিখি। সেসব নিয়ে এবারই প্রথম গল্পগ্রন্থ আসছে, তার  প্রচ্ছদ হাতে এসেছে। জীবনের টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলো, চলতি পথের আনন্দ বেদনাগুলো নিজের ভাষায়, নিজের মত করে রেখে যেতে চাই। কেউ আমায় কেন লিখি, এ প্রশ্ন করলে আমি বোধহয় এই সহজ সত্য জবাবটাই দিব। যাই হোক— দারুন সুন্দর প্রচ্ছদটি একবারেই পছন্দ করেছি কোন পরিবর্তন ছাড়াই। 

জানুয়ারির শুরু থেকেই দেশে প্রচন্ড ঠান্ডা পড়ছে।  দ্বিতীয় সপ্তাহেও তা অব্যাহত আছে। আমেরিকার ঠান্ডা বা বরফের তুলনায় সে ঠান্ডা বেশি নয় কিন্তু এখানকার মত ব্যবস্থাপনা তো বাংলাদেশে নেই। শুধু ব্যবস্থাপনার কথা কী বলছি কত কত মানুষের তো মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুই নেই। সেইসব মানুষদের জন্য এই ঠান্ডা সীমাহীন দুর্ভোগের। টেলিভিশনে সংবাদ দেখা খুব একটা হয় না সময়ের কারণেই। তবে, আজকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে কোন সংবাদই চোখ এড়ায় না। ফুটপাতে, রেল স্টেশনে ছোট ছোট শিশুদের বস্তা বা পাপোশ মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকার দৃশ্য ভীষণ কষ্ট দেয়। ভেতর থেকে নিজেকে ক্ষুদ্র করে দেয়, মানুষ পরিচয়টা তখন আমার জন্য নয় বলে মনে হয়। 

এই সময়ে সামান্য সামর্থ নিয়ে কিছু করার চেষ্টা করছে আমাদেরই কিছু বন্ধু। ‘এক টাকা জামা’ প্রকল্প নিয়ে ওরা ছুটছে অসহায় মানুষদের কাছে দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। এই মানুষগুলো কোন রাজনৈতিক দলের নয়, ওদের বাহবা পাওয়ার বা নাম কুড়ানোর হীন উদ্দেশ্যও নেই। সবাই কর্মক্ষেত্রে নিজ নিজ অবস্থানে সুনামের সাথেই কাজ করেছে। তাতেই ওদের পেটের ক্ষুধা মেটানো সম্ভব হচ্ছে। এই কাজটা তারা করছে ভেতরের তাগিদ থেকে মনের ক্ষুধা মেটাতে। 

আমার বন্ধু কবি অনার্য শান্ত বাবার স্মৃতি ধরে রাখতে, বাবার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় অনগ্রসর নিজ এলাকায় একটা পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেছে। এক সময় নিজের স্বপ্ন ছিল এলাকায় পাঠাগার গড়ে তুলব। কেউ যখন একই রকম স্বপ্ন হৃদয়ে লালন করে, তখন বড্ড আত্মিক লাগে, কাছের লাগে; সে প্রাণে, সে কাজে মিশে যেতে ইচ্ছে করে। এই চমৎকার ও মহতি উদ্যোগে দূর হতে আছি ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে। পাঠাগারের উদ্বোধনী দিনে ‘এক টাকার জামা’ টিম শীতের কম্বল বিতরণ করেছে ঐ এলাকায় অর্থাৎ ময়মনসিংহ’র সুসং দুর্গাপুরের শীতার্ত চা শ্রমিকদের মাঝে। ওদের কাজকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে স্যালুট জানাই। 

ক’দিন ধরে প্রকৃতির বৈরি রূপ মনের অস্থিরতাকে বাড়িয়ে তুলছে বহুগুণ। খুব মন খারাপ প্রকৃতি আমার কখনোই ভালো লাগে না। খুব ঠান্ডা হোক, অনেক কান্না ঝরুক তবু দেখতে ঝকঝকে দিন আমার পছন্দ। জানি না কেন জানি, মনমরা, সূর্যবিহীন দিনগুলোয় আমারও মন খারাপ থাকে—চাইলেও হাসতে পারি না প্রাণখুলে। অথচ, হাসতে না পারলে আমার আবার খাবার হজম হয় না। 

আমি বরাবরই হৃদয়হীন টাইপ মানুষ। সহজে কাঁদি না, অনেক ভাবনার বিষয় সামনে এলেও ভাবলেশহীন থাকি। সহজে অনেক বেশি উৎফুল্লও হই না—তবে প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশি বোধহয় হাসি, অন্যদেরও হাসাই। আমার বর বলে, আমার দু’টো রোগ আছে। একটা হাসি রোগ আর অন্যটা প্রেমে পড়ার রোগ। 

মেয়েটা চারদিন ছুটি হাতে রেখেই বৃহস্পতিবার ডর্মে চলে গেল, শুক্রবার তার সেমিস্টার ফাইনাল তাই। আমি ওকে ঘুমে রেখে কাজে গেলাম। ফিরে এসে আমার খালি ঘর। অন্য আর সব মায়ের মন খারাপ হত, আমার কিন্তু একদম হয়নি। অন্তত আমার পাশে থাকা মানুষটা তো টের পায়নি, সব অনুভূতি টের পাওয়া সমান জরুরী নয়। 

যাই হোক… শনিবার সন্ধ্যায় এক প্রতিবেশি ভাবী ফোন করে বললেন, অপর প্রতিবেশির নতুন বেয়াই-বেয়াইন-কন্যা-জামাই এসেছে। আপনিও আসেন। ঐ বাসায় একটা জম্পেশ আড্ডার সন্ধ্যা কাটলো। রাজ্যের খাবার খেয়ে ভারি আর হাহাহিহি করে হালকা হয়ে এলাম। এমনি করেই কোন কোন সন্ধ্যা হঠাৎই আনন্দ সন্ধ্যা হয়ে ধরা দেয় আমার কাছে। 

বাইরে এখনো বৈরি বাতাস। ঠান্ডা প্রচন্ড। মেয়েটা ডর্মে একা। ছেলেটার শরীর একটু খারাপ। প্রতিবেশির বাসা থেকে ফেরার পর রাতে ছেলেটার প্রচন্ড জ্বর এল। ১০২ ডিগ্রি, কিন্তু সর্দি কাশি কিছুই নেই। ওখান থেকে ফিরে গা মুছে ঔষধ খাইয়ে শুইয়ে দিয়েছি। মজুমদার দুই শিফ্ট কাজ করে এসেছে। বলল, ছেলেকে রাতে একা রাখা ঠিক হবে না, আমাদের কাছে নিয়ে আসো। আমি বললাম, তুমি রুমে একা ঘুমাও। তোমার আবার সকালে কাজ আছে, আমি ছেলের কাছে থাকব। গভীর রাত পর্যন্ত জলপট্টি দিয়েছি, জ্বর কমছিলই না। ভোরের দিকে জ্বর কমেছে, মা-ছেলে ঘুমিয়েছি অনেক বেলা পর্যন্ত। পরে অবশ্য আর তেমন জ্বর আসেনি। সোমবার মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ডে, স্কুল বন্ধ। একদিক থেকে ভালই হয়েছে রবি ও সোমবার বাসায় ছিল, বিশ্রাম নিয়েছে। বাচ্চার শরীর খারাপ থাকলে পুরো দুনিয়াই নিমেষে আঁধার হয়ে যায়। 

এই সময়টা অনেক ঠান্ডা হওয়ায় বাইরে থেকে এসে দৌড়ে ঘরে প্রবেশ করি, সবারই একই অবস্থা। দিনের বেলা কাজে থাকি আবার শীতের দিন ছোট বলে ঘরে ফিরতে ফিরতেই সন্ধ্যা। ফলে নভেম্বরের শেষদিকে বারবারার মৃত্যুর পর জিমিকে দেখিনি একদিনও। জানুয়ারির মাঝামাঝি একদিন কাজ থেকে ফিরে জিমিকে পাকঘরে ছোট্ট টেবিলটায় এক চেয়ারে বসে রাতের খাবার খেতে দেখলাম। আগে ওরা মুখোমুখি দুই চেয়ারে দু’জন বসে খেত। যে চেয়ারে বারবারা বসত সে চেয়ারে আজ জিমি বসেছে। আর জিমি যে চেয়ারে বসত ওটা খালি। যতক্ষণ সে খাবার খেয়েছে আমি আমাদের পাকঘর থেকে ততক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখেছি। তারপর উপরে গিয়েছি, জামা কাপড় বদল করেছি। আগে দু’জনকে একসাথে খেতে দেখলে যেমন মনের ভেতর এক অনাবিল আনন্দ খেলে যেত, আজ জিমিকে একা খেতে দেখে তেমনই এক নির্মম বিষাদ ভেতরটাকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে গেল। জিমির একলা, নিঃসঙ্গ জীবন মুহুর্তে কাঁপিয়ে দিল অন্তরাত্মাকে! 

শুধু মন খারাপের কথা বলেই নতুন বছরের প্রথম লেখাটা শেষ করতে চাই না। অবশ্য জীবন মানেই ভালো খবর, মন্দ খবর মিলেমিশে একাকার। এবছর দু’টো বই বের হচ্ছে আমার একটা কবিতার একটা গল্পের। এরচেয়ে বড় আনন্দের আর কিছু নেই। তবে, আরো কিছু সুখবর আছে, অন্তত আমার জন্য এবং আমার কাছে। 

প্রতি বছর এসময়টায় অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি এলেই আমার ভীষণ মন খারাপ থাকে, সেটা আজকের কথা নয়। এদেশে আসার পর থেকেই এমনটা হয়। মনে হয় আর সারা বছর যেখানেই থাকি, যেমনই থাকি.. ফেব্রুয়ারি মাসটা যদি দেশে থাকতে পারতাম!? প্রায় সময়ই আমার সহকর্মীদের আমি একটা কথা বলি, বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারি আসে উৎসবের বার্তা নিয়ে, আর সেটা চলে মার্চের শেষ পর্যন্ত। এসময়টা ওখানে বসন্তকাল, আবহাওয়াও চমৎকার। ওরা জিজ্ঞেস করে তাহলে তুমি যাও না কেন? স্মিত হেসে বলি, যাবো কি ওখানেই তো থাকি মনে মনে। 

বসন্ত উৎসব, ভালোবাসা দিবস কিংবা বইমেলার কথা মনে হলেই মনটা উদাস হয়ে যায়। আর গত দু’বছর ধরে নিজের বই প্রকাশিত হচ্ছে, ফলে শারিরীকভাবে আমেরিকায় থাকলেও মন পড়ে থাকে অন্যত্র। ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস, এখন আর শুধু বাংলা ভাষার নয়, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বুকের ভেতর মা’কে ধরেই থাকি যদিও দেখা হয় না বছরের পর বছর। 

ভাষা, বই বা বইমেলার প্রসঙ্গ এলে কিছু কথা অনিবার্যভাবেই চলে আসে এসময়ে। সেটা হলো,  অনেকেই নতুন লেখকদের বই নিয়ে নানারকম তীর্যক মন্তব্য করে থাকেন। নতুন হলেই ভালো লিখবে না, এমনটা ভাবা ঠিক নয় মোটেই। নতুন লেখকরা নিজের   টাকায় বই প্রকাশ করে এসব কথাও বলে অনেকে কটাক্ষ করে। আবার বই বিক্রি বা বিপণন নিয়ে কথা হয়, কিন্তু নতুনদের বইকে প্রচার করার জন্য সেরকম কোন ব্যবস্থা আমাদের দেশে নেই। ফলে কেউ নিজের বইয়ের বিপণনের চেষ্টা করলে তাতে দোষণীয় কিছু নেই। 

আমাদের প্রকাশনা শিল্প খুবই ছোট। মূলতঃ ওটা এখনো শিল্পই হয়ে উঠেনি। অনেকেই আরো কয়েকটা ব্যবসার সাথে একটা পরিচিতি কিংবা অন্য উদ্দেশ্যে প্রকাশনার সাথে যুক্ত থাকেন। বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির হিসেব মতে দেশে বইয়ের প্রকাশনা ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন প্রায় চার হাজারের মত প্রকাশক-ব্যবসায়ী। তবে এসব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে বছরে কি পরিমাণ বই প্রকাশিত হয় তার সঠিক হিসেব পাওয়া যায়নি। এই মাধ্যমের সাথে জড়িতরা মনে করেন প্রকাশনাটা এখনও বড় বা শক্তিশালী কোন ব্যবসা নয় শুধু মধ্যম আয়ের একটা ব্যবসা হিসেবে দাড়াতে পেরেছে। এর কারণ হিসেবে পুঁজির সমস্যাটাই প্রধান সমস্যা বলে তাঁরা মনে করেন। ব্যাংকগুলো অন্যান্য ব্যবসাতে যেমন বিনিয়োগ করে এই ব্যবসায় সেটা করতে চায় না। 

অন্যান্য সমস্যার মধ্যে রয়েছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলোর নিজস্ব পাবলিকেশন্স হাউজ না থাকা, যথাযথ প্রচারণার ব্যবস্থা না থাকা, আমদানিকৃত কাগজে বই ছাপানোর কারণে বর্ধিত দাম ইত্যাদি।

যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যে যেখানে কয়েক লক্ষ বই ছাপা হয় সেখানে আমাদের দেশে সেই সংখ্যা হাজার ছাড়াতেই হিমশিম খায়। আবার পাঠাভ্যাসের কথা বলতে গেলে সেখানেও আমাদের অবস্থান হিসেবে আনার মতো নয়। তাই নতুন লেখাকে কিংবা নতুন পাঠককেও কোনওভাবে নিরুৎসাহিত করে এমন কোন কথাই কোন লেখকের বলা উচিত নয়। বরং নতুন লেখক ও পাঠকদের নানাভাবে উৎসাহিত করা খ্যাতিমান ও প্রতিষ্ঠিত লেখকদের কর্তব্য বলে মনে করি। 

কী কারণে, কেন যে এত কথা লিখলাম বা এভাবে ভাবছি জানি না। তবে, যা জানি তা হল এবারের একুশে বইমেলার অংশ হব আমিও। বইমেলার শেষ সপ্তাহে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে প্রাণের মেলায় মিলিত হব। এই আনন্দটাই মনকে অন্য রকম করে অস্থির করে রেখেছে পুরো জানুয়ারি জুড়ে। আশা করছি আমার বন্ধু-পরিজন-পাঠক-শুভানুধ্যায়ীদের সাথে বহু বহু বছর স্মরণে রাখার মত কিছু সময় পাব। সেই আনন্দ প্রহরের অপেক্ষায় এখনকার মত জীবন চলতে থাকুক যেমন চলছে। 

কুলসুম আক্তার সুমী, নিউজার্সি, যুক্তরাষ্ট্র

(২৭ জানুয়ারি, ২০২৩)